সোমবার ২রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

ওয়াদা রক্ষা: ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ থেকে জীবনের প্রতিটি অঙ্গীকার

তৈয়ব আলী খান   সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ওয়াদা রক্ষা: ‘আলাস্তু বিরাব্বিকুম’ থেকে জীবনের প্রতিটি অঙ্গীকার

মানুষের জীবন আসলে অসংখ্য ওয়াদা, দায়িত্ব ও অঙ্গীকারের সমষ্টি। জন্মের পর থেকেই আমরা কোনো না কোনো সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হই, কোনো না কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করি এবং কারও না কারও প্রত্যাশার অংশ হয়ে উঠি। পিতা-মাতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক, সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব, স্বামী-স্ত্রীর বন্ধন, বন্ধুত্ব, প্রতিবেশী, কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে বিশ্বাস ও অঙ্গীকারের একটি অদৃশ্য সেতু।

কিন্তু এসব পার্থিব অঙ্গীকারেরও আগে রয়েছে আমাদের সবচেয়ে বড় ও চিরন্তন অঙ্গীকার—আমাদের রবের সঙ্গে অঙ্গীকার।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন—

أَلَسْتُ بِرَبِّكُمْ قَالُوا بَلَىٰ

“আমি কি তোমাদের রব নই?” তারা বলল, “অবশ্যই, আপনি আমাদের রব।”

—সূরা আল-আ‘রাফ: ১৭২

এই আয়াতের মধ্যে যেন মানুষের অস্তিত্বের গভীরতম পরিচয়টি লুকিয়ে আছে। আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন—“আমি কি তোমাদের রব নই?” আর মানবজাতি উত্তর দিয়েছে—“অবশ্যই, আপনি আমাদের রব।”

এই ‘বালা’—অর্থাৎ ‘অবশ্যই’—শুধু একটি শব্দ নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত এক মহান অঙ্গীকারের স্মারক।

তাই জীবনের প্রতিটি ওয়াদা নিয়ে আমাদের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমি কি আমার প্রথম ওয়াদাটি মনে রেখেছি?

আমি কি আমার রবকে স্মরণ করছি?
আমি কি তাঁর দেওয়া দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ত?
আমি কি সত্যবাদী?
আমি কি আমানত রক্ষা করি?
আমি কি মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিই?
আমি কি পিতা-মাতার হক আদায় করি?
সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করি?
স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বস্ত থাকি?
কর্মক্ষেত্রে আমানতদার হই?
ব্যবসায় প্রতারণা করি না?
রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পদকে নিজের সম্পদের মতো রক্ষা করি?

কারণ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের সত্যতা মানুষের সঙ্গে আমাদের আচরণেও প্রতিফলিত হওয়ার কথা।

───
ওয়াদা—শুধু একটি কথা নয়, একটি আমানত
আমরা অনেক সময় মনে করি, “আমি করব”, “আমি আসব”, “আমি দেব”, “আমি পাশে থাকব”—এ ধরনের কথাই শুধু ওয়াদা। কিন্তু ওয়াদার পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত।

কেউ যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখনও একটি অঙ্গীকার তৈরি হয়। কেউ যখন কোনো সম্পদ নিজের জিম্মায় নেয়, তখন সে আমানতের দায়িত্ব গ্রহণ করে। কেউ যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয়, তখন সে প্রতিষ্ঠানের প্রতি দায়িত্ব গ্রহণ করে। কেউ যখন ব্যবসায় চুক্তি করে, তখন সে একটি বৈধ অঙ্গীকারে প্রবেশ করে। কেউ যখন সন্তানকে সময় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, সেটিও একটি ওয়াদা।

একজন বাবা যখন সন্তানকে বলেন, “আমি তোমার পাশে আছি”—সন্তানের কাছে সেটি শুধু একটি বাক্য নয়; এটি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি।

একজন মা যখন সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দেন, সেটিও ভালোবাসার অঙ্গীকার।

একজন স্বামী যখন স্ত্রীকে সম্মান ও নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব নেন এবং স্ত্রী যখন স্বামীর সঙ্গে বিশ্বস্ততার বন্ধনে আবদ্ধ হন—এটিও একটি পবিত্র অঙ্গীকার।

একজন ব্যাংকার যখন আমানতকারীর অর্থ ও তথ্যের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেন, একজন চিকিৎসক যখন রোগীর সেবার দায়িত্ব নেন, একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর চরিত্র ও জ্ঞান গঠনের দায়িত্ব নেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন জনগণের সেবা করার দায়িত্ব নেন—এসবই আমানত। অতএব ওয়াদা রক্ষা মানে শুধু কথা রাখা নয়; ওয়াদা রক্ষা মানে দায়িত্ব, আমানত ও বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা।

───
হৃদয়স্পর্শী একটি ঘটনা –
একজন বৃদ্ধ বাবা জীবনের শেষ সময়ে হাসপাতালে শুয়ে ছিলেন। তাঁর পাশে বসে ছিল তাঁর একমাত্র ছেলে। বৃদ্ধ বাবা দুর্বল কণ্ঠে ছেলেকে বললেন, “বাবা, তুমি ছোটবেলায় একদিন আমাকে বলেছিলে—‘বাবা, তুমি বুড়ো হলে আমি তোমার পাশে থাকব।’ কথাটা কি মনে আছে?” ছেলে কিছুক্ষণ নীরব থাকল। হ্যাঁ, কথাটি তার মনে আছে। অনেক বছর আগে ছোট্ট একটি শিশু বাবার হাত ধরে সেই কথা বলেছিল। বাবা আবার বললেন, “আমি তোমার সেই কথাটি ভুলিনি।” ছেলের চোখে পানি এসে গেল। জীবনে সে অনেক বড় হয়েছে। অর্থ উপার্জন করেছে, বাড়ি করেছে, গাড়ি করেছে, সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়িয়েছে। কিন্তু ব্যস্ততার ভিড়ে বাবার জন্য সময় বের করতে পারেনি। সেদিন হাসপাতালের বিছানায় দাঁড়িয়ে সে বুঝল—কিছু ওয়াদা কাগজে লেখা থাকে না; কিন্তু মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকে।

এই ঘটনাটি আমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি আয়না। আমরা কত ওয়াদা করি, কত কথা দিই, কত মানুষ আমাদের কথার ওপর ভরসা করে—কিন্তু আমরা কি সবসময় মনে রাখি?

───
আল্লাহর সঙ্গে আমাদের প্রথম ওয়াদা

মানুষের সব অঙ্গীকারের মধ্যে সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার হলো আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের অঙ্গীকার। “আলাস্তু বিরাব্বিকুম”—আমি কি তোমাদের রব নই? “কালু বালা”—তারা বলল, অবশ্যই। আমরা কালেমা পাঠ করি—লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। এটি শুধু পরিচয়ের বাক্য নয়; এটি জীবনের দিকনির্দেশনা। আমরা যখন বলি—আল্লাহ আমাদের রব, তখন আমাদের জীবনে তাঁর নির্দেশনার প্রতি সম্মান থাকা উচিত। আমরা যখন বলি—আমরা তাঁর বান্দা, তখন আমাদের অহংকার, লোভ, অন্যায় ও প্রবৃত্তির ওপর আল্লাহর সন্তুষ্টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন—
“তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” —সূরা আল-ইসরা: ৩৪
অর্থাৎ ওয়াদা শুধু সামাজিক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আখিরাতের জবাবদিহি।

───
সালাতের ওয়াদা যেন জীবনের ওয়াদা হয়
আমরা প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহর সামনে দাঁড়াই। সূরা ফাতিহায় বলি—“ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাস্তাঈন।”
“আমরা শুধু তোমারই ইবাদত করি এবং শুধু তোমারই সাহায্য চাই।”—সূরা আল-ফাতিহা: ৫

এই ঘোষণা যদি আমাদের হৃদয়ে সত্যিই জীবন্ত থাকে, তাহলে এর প্রভাব আমাদের আচরণেও পড়ার কথা।

নামাজ পড়ে বেরিয়ে এসে যদি আমরা মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করি, মিথ্যা বলি, আমানত আত্মসাৎ করি, কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বে ফাঁকি দিই, দুর্বল মানুষের অধিকার নষ্ট করি—তাহলে আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, আমাদের ইবাদতের শিক্ষা জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে?

সালাত তাই শুধু কয়েক মিনিটের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সারাদিনের নৈতিক জীবনের একটি স্মারক।

প্রতিটি সালাতের পর আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে—
আজ আমি কারও ওয়াদা ভঙ্গ করেছি কি?
কারও হক নষ্ট করেছি কি?
কাউকে মিথ্যা আশা দিয়েছি কি?
কোনো আমানতে খেয়ানত করেছি কি?
এই আত্মজিজ্ঞাসাই হতে পারে আত্মশুদ্ধির সূচনা।

───
রাসূলুল্লাহ ﷺ—বিশ্বস্ততার সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত
নবুওয়াতের আগেই মক্কার মানুষ রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আল-আমিন—বিশ্বস্ত ও আমানতদার—হিসেবে চিনত। তাঁর বিরোধীরাও তাঁর কাছে আমানত রাখত। এটি চরিত্রের এক অসাধারণ শিক্ষা। নৈতিকতা কখনো শুধু বন্ধুর জন্য নয়। সততা শুধু নিজের দলের জন্য নয়। আমানত শুধু প্রিয় মানুষের জন্য নয়। যে আমার বন্ধু, তার আমানত রক্ষা করব—এটি সহজ। কিন্তু যে আমার সঙ্গে একমত নয়, তার আমানতও রক্ষা করব—এটাই নৈতিকতার উচ্চতা।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, তখন খেয়ানত করে।”
—সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম

এই হাদিস আমাদের ভয় দেখানোর জন্য নয়; বরং চরিত্রের বিপজ্জনক অবক্ষয় সম্পর্কে সতর্ক করার জন্য।
একটি মিথ্যা কথা, একটি ভঙ্গ করা ওয়াদা, একটি খেয়ানত—ধীরে ধীরে মানুষের চরিত্রের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
───
পিতা-মাতার সঙ্গে আমাদের ওয়াদা
পিতা-মাতা আমাদের জীবনের প্রথম আশ্রয়। আমরা হাঁটতে শেখার আগে তাঁরা আমাদের ধরে হাঁটিয়েছেন। আমরা কথা বলতে শেখার আগে তাঁরা আমাদের কথা বুঝেছেন। আমরা অসুস্থ হলে তাঁরা রাত জেগেছেন। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য তাঁরা নিজেদের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—
“তোমার রব আদেশ করেছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করবে।”
—সূরা আল-ইসরা: ২৩

পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো আচরণ তাই শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ইবাদতের অংশ। শৈশবে সন্তান পিতা-মাতার ওপর নির্ভরশীল থাকে। একসময় পিতা-মাতা বয়সের ভারে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।

জীবনের এই চক্রটি যেন আমরা ভুলে না যাই। বৃদ্ধ পিতা-মাতা যখন একই কথা বারবার বলেন, ধৈর্য ধরুন। যখন তাঁদের হাঁটতে কষ্ট হয়, হাত ধরুন। যখন তাঁদের কথা শুনতে ইচ্ছা করে, সময় দিন। কারণ কোনো কোনো মানুষ জীবনের শেষ সময়ে টাকা নয়—সন্তানের একটু সময় চান।

───
সন্তানের সঙ্গে আমাদের নীরব ওয়াদা
সন্তান জন্মের সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মায়ের ওপর একটি নীরব দায়িত্ব এসে পড়ে। শুধু খাবার, পোশাক, স্কুল ও কোচিং নয়—সন্তানের প্রয়োজন ভালোবাসা, নিরাপত্তা, মূল্যবোধ, সময়, শ্রদ্ধা এবং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে বাবা-মাকে দেখা। আমরা সন্তানকে বলি—মিথ্যা বলবে না। কিন্তু সে যদি দেখে বাবা ফোনে মিথ্যা বলছেন? আমরা বলি—অন্যের জিনিস অনুমতি ছাড়া নেবে না। কিন্তু সে যদি দেখে বড়রা অন্যের অধিকারকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না? আমরা বলি—সময় মেনে চলবে। কিন্তু সে যদি দেখে বাবা-মা নিজেরাই প্রতিশ্রুত সময় রাখছেন না? সন্তান আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে বেশি আমাদের আচরণ দেখে শেখে। তাই সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ওয়াদা হলো—নিজে এমন মানুষ হওয়া, যাকে দেখে সন্তান মানুষ হতে শেখে।
───
স্বামী-স্ত্রীর অঙ্গীকার
বিবাহ একটি পবিত্র বন্ধন। এখানে শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও রয়েছে; শুধু প্রত্যাশা নয়, ত্যাগও রয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”
—সূরা আর-রূম: ২১

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক প্রতিযোগিতার নয়; সহযোগিতার।
রাগের সময় এমন কথা বলা উচিত নয় যা সম্পর্ককে ধ্বংস করে। সাময়িক আবেগে এমন ওয়াদা বা হুমকি দেওয়া উচিত নয় যার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
দাম্পত্য জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ওয়াদাগুলোর একটি হতে পারে—
“আমি তোমার দুর্বলতার সুযোগ নেব না; তোমার মর্যাদা রক্ষা করব।”
───
কর্মক্ষেত্রে ওয়াদা: চাকরি শুধু বেতন নয়, আমানত
চাকরি গ্রহণের সময় আমরা হয়তো মুখে বলি না—“আমি ওয়াদা করছি।”
কিন্তু নিয়োগপত্র গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটি দায়িত্ব গ্রহণ করি।
সময়ের প্রতি দায়িত্ব।
কাজের প্রতি দায়িত্ব।
প্রতিষ্ঠানের সম্পদের প্রতি দায়িত্ব।
সহকর্মীর প্রতি দায়িত্ব।
গ্রাহকের প্রতি দায়িত্ব।
গোপনীয়তার প্রতি দায়িত্ব।
আইন ও নীতিমালার প্রতি দায়িত্ব।

অফিসে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন না করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ অপব্যবহার করা, অন্যের কাজ নিজের নামে নেওয়া, গ্রাহকের তথ্যের অপব্যবহার করা—এসব শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; নৈতিকতারও প্রশ্ন।

বিশেষ করে ব্যাংকিং, চিকিৎসা, শিক্ষা, প্রশাসন ও জনসেবার মতো পেশায় মানুষের বিশ্বাসই সবচেয়ে বড় মূলধন।
একজন ব্যাংকারের হাতে শুধু টাকা নয়—মানুষের সঞ্চয়, স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের একটি অংশ থাকে।
একজন চিকিৎসকের কাছে রোগী শুধু একটি কেস নয়—একটি পরিবার তার ওপর আশা রাখে।
একজন শিক্ষকের হাতে শুধু বই নয়—একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
একজন সরকারি কর্মকর্তার ডেস্কে শুধু ফাইল নয়—অনেক মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশা অপেক্ষা করে।
তাই পেশাগত দায়িত্বও এক ধরনের ওয়াদা।

───
গ্রাহক ও ব্যবসায়িক সম্পর্কের ওয়াদা
ব্যবসা শুধু লাভের হিসাব নয়; ব্যবসার মূলভিত্তি হলো বিশ্বাস।
ব্যবসায়ী যদি বলেন—পণ্যটি নির্দিষ্ট মানের, তাহলে তা সেই মানের হওয়া উচিত।
সেবা প্রতিষ্ঠান যদি বলে—নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়া হবে, তাহলে যথাসম্ভব সেই প্রতিশ্রুতি পালন করা উচিত। আবার গ্রাহকেরও দায়িত্ব আছে—সঠিক তথ্য দেওয়া, পাওনা পরিশোধ করা, চুক্তির শর্ত পালন করা এবং প্রতারণা না করা। দুই পক্ষের মধ্যে যদি শুধু “আমি কী পাব?” প্রশ্ন থাকে, তাহলে সম্পর্ক দুর্বল হয়।
কিন্তু যদি উভয় পক্ষ প্রশ্ন করে— “আমি আমার ন্যায্য দায়িত্ব কতটা পালন করছি?” তাহলে ব্যবসায় আস্থা তৈরি হয়।
───
“কোথাও ফাঁকি দেব না”—একটি ব্যক্তিগত অঙ্গীকার
আমরা চাইলে আজ নিজেদের জন্য কয়েকটি ছোট ওয়াদা করতে পারি—
আমি মিথ্যা বলব না।
আমি ওজনে কম দেব না।
আমি মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নেব না।
আমি দায়িত্বে অযথা ফাঁকি দেব না।
আমি অন্যের অধিকার নষ্ট করব না।
আমি আমানতে খেয়ানত করব না।
আমি সরকারি সম্পদকে ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করব না।
আমি সময়ের মূল্য দেব।
আমি ভুল করলে স্বীকার করব।
আমি কারও সঙ্গে অন্যায় করলে ক্ষমা চাইব এবং সম্ভব হলে ক্ষতিপূরণ করব।
আমি এমন ওয়াদা করব না, যা রাখার সামর্থ্য বা ইচ্ছা আমার নেই।
এগুলো হয়তো ছোট ছোট বাক্য। কিন্তু একটি সমাজের নৈতিক বিপ্লব অনেক সময় এমন ছোট অঙ্গীকার থেকেই শুরু হয়।

───
রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের অঙ্গীকার
রাষ্ট্র শুধু সরকার বা প্রশাসনের নাম নয়। রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাগরিক, আইন, প্রতিষ্ঠান, জনসম্পদ, অধিকার ও দায়িত্ব। নাগরিকের দায়িত্ব হলো আইন মেনে চলা, বৈধ কর ও পাওনা পরিশোধ করা, সরকারি সম্পদ রক্ষা করা, পরিবেশ রক্ষা করা, অন্যের অধিকার সম্মান করা এবং নিজের দায়িত্বশীল নাগরিক ভূমিকা পালন করা।

একইভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও জনগণের অধিকার, আইন ও ন্যায়ের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে।

ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি একটি আমানত।
যে কোনো দায়িত্বশীল অবস্থানে থাকা ব্যক্তির জন্য তাই একটি প্রশ্ন সবসময় সামনে থাকা উচিত—
“এই ক্ষমতা কি আমার ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য, নাকি মানুষের অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য?”
জনসম্পদ, সরকারি পদ, দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত—সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জবাবদিহি।

───
প্রতিবেশীর প্রতি আমাদের ওয়াদা
একটি ভালো সমাজের সূচনা হয় পাশের বাড়ি থেকে।
আমাদের কারণে যেন প্রতিবেশী অযথা কষ্ট না পান।
অতিরিক্ত শব্দ, রাস্তা দখল, ময়লা ফেলা, চলাচলে বাধা সৃষ্টি, পার্কিংয়ের কারণে অন্যের অসুবিধা, অসুস্থ বা বৃদ্ধ প্রতিবেশীর প্রতি উদাসীনতা—এসব শুধু নাগরিক অসৌজন্য নয়; এগুলো সামাজিক দায়িত্বেরও প্রশ্ন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রতিবেশীর অধিকারের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাই আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত—
“আমার কারণে আমার প্রতিবেশী কি নিরাপদ ও স্বস্তিতে আছেন?”

───

পরিবেশের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার

গাছ, নদী, পাখি, মাটি, পানি ও বাতাস—এসবের সঙ্গে মানুষের জীবন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।

আমরা কি গাছের গায়ে পেরেক ঠুকে ব্যানার লাগানোর আগে ভাবি—গাছটিও একটি জীবন্ত সৃষ্টি?

আমরা কি নদীতে ময়লা ফেলার আগে ভাবি—এই পানি কত মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত?

আমরা কি অপ্রয়োজনে বিদ্যুৎ ও পানি অপচয় করার আগে ভাবি—সম্পদ সীমাহীন নয়?

কুরআনে আল্লাহ বলেন—

“তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।”

—সূরা আল-আ‘রাফ: ৩১

প্রকৃতি আমাদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আমরা এর দায়িত্বশীল ব্যবহারকারী।

তাই পরিবেশ রক্ষা করাও আমাদের নৈতিক অঙ্গীকার।

───

ন্যায়বিচার—শুধু নিজের মানুষের জন্য নয়

ওয়াদা ও নৈতিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ন্যায়বিচার।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—

“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার না করতে প্ররোচিত করে। তোমরা ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।”

—সূরা আল-মায়িদা: ৮

এটি অত্যন্ত গভীর শিক্ষা।

আমরা অনেক সময় নিজের মানুষকে ভালোবাসি এবং তার ভুলও ক্ষমা করতে চাই। কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই, যখন অপর পক্ষ আমাদের পছন্দের নয়।

যে আমার বন্ধু নয়, তার অধিকারও অধিকার।

যে আমার মতের মানুষ নয়, তার মর্যাদাও মর্যাদা।

যে আমার সঙ্গে একমত নয়, তার প্রতিও ন্যায়বিচার করতে হবে।

এটাই ইসলামের নৈতিক সৌন্দর্য।

───

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মানবতার প্রতি অঙ্গীকার

আজকের পৃথিবী পরস্পর নির্ভরশীল।

এক দেশের পরিবেশ দূষণ অন্য দেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এক দেশের অর্থনৈতিক সংকট অন্য দেশের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগ ও খাদ্যসংকট—এসবের কোনোটি শুধু একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

তাই আন্তর্জাতিক চুক্তি, বৈধ প্রতিশ্রুতি, মানবিকতা, শান্তি ও পারস্পরিক সম্মানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

মানুষের পরিচয়ের আগে আমাদের একটি বৃহত্তর পরিচয় আছে—আমরা মানুষ।

অন্যের কষ্টে সহমর্মী হওয়া, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায় ও নিরপরাধ মানুষের ওপর জুলুম না করা—এসবও মানবতার অঙ্গীকার।

───

ওয়াদা রাখতে না পারলে কী করব?
মানুষ ভুল করতে পারে।
কখনো পরিস্থিতি এমন হতে পারে যে একটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সত্যিই সম্ভব হলো না।
তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সততা।
মিথ্যা অজুহাত নয়।
সত্যটি জানাতে হবে।

যার সঙ্গে ওয়াদা ছিল, তাকে যথাসম্ভব দ্রুত জানাতে হবে। তার ক্ষতি হয়ে থাকলে সম্ভব হলে তা পূরণ করতে হবে। নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে অযথা প্রতিশ্রুতি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আর যদি কোনো মানুষের অধিকার জড়িত থাকে, তাহলে শুধু মুখে “আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন” বললেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। মানুষের হক থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার বা যথাসম্ভব সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।

আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন।”
—সূরা আল-বাকারা: ২২২
অর্থাৎ ভুলের পরও ফিরে আসার দরজা খোলা।

───

ওয়াদা ভঙ্গের সবচেয়ে বড় ক্ষতি—বিশ্বাসের মৃত্যু

একজন মানুষ যখন বারবার ওয়াদা ভঙ্গ করে, তখন শুধু একটি কাজ অসম্পূর্ণ হয় না—তার প্রতি মানুষের বিশ্বাস কমতে থাকে।
একজন বাবা যদি বারবার সন্তানের কথা না রাখেন, সন্তান একসময় তাঁর কথাকে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করতে পারে।
একজন ব্যবসায়ী যদি বারবার গ্রাহককে প্রতারিত করেন, তার ব্যবসার প্রতি আস্থা কমতে পারে।
একজন প্রতিষ্ঠান যদি প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, গ্রাহকের বিশ্বাস নষ্ট হতে পারে।
একটি সমাজে যদি কথার মূল্য না থাকে, তাহলে চুক্তি বাড়বে, কাগজ বাড়বে, আইন বাড়বে—কিন্তু বিশ্বাস কমবে।
আর বিশ্বাসের সংকট কোনো সমাজের জন্যই ছোট সংকট নয়।
কারণ অর্থ হারালে মানুষ আবার উপার্জন করতে পারে; কিন্তু বিশ্বাস হারালে তা পুনর্গঠন করতে অনেক সময় লাগে।

───
আমাদের প্রতিদিনের একটি ছোট আত্মজিজ্ঞাসা
দিন শেষে কয়েক মিনিট আমরা নিজেদের জন্য রাখি।
নিজেকে জিজ্ঞাসা করি—
আজ আমি কি সত্য বলেছি?
আজ আমি কি কারও ওয়াদা ভঙ্গ করেছি?
কাউকে কি অযথা আশা দিয়েছি?
কারও আমানত কি আমার কাছে নিরাপদ ছিল?
পিতা-মাতার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছি?
সন্তানকে দেওয়া কথা কি রেখেছি?
স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি আমার আচরণ কেমন ছিল?

লেখক: মো: তৈয়ব আলী খান
ব্যাংক কর্মী, লেখক, বিশ্লেষক

Facebook Comments Box

Posted ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Sangbad Dinrat |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

এ বিভাগের আরও খবর

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 ১২৩৪৫
৭৮৯১০১১১১৩
৪১৫১৬১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৯৩০  

উপদেষ্টা
শহিদুল ইসলাম সাগর
চেয়ারম্যান, বিটিইএ

প্রতিষ্ঠাতা
মাহমুদ স্বপন

বার্তা, ফিচার ও বিজ্ঞাপন:
+৮৮ ০১৩১৩ ৮৮ ৪৪ ৩৩
ইমেইল: sangbaddinrat@gmail.com

বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন কর্তৃক নিবন্ধিত।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদনকৃত।