শনিবার (৪ জুলাই ২০২৬) রাতের ঘটনাটি দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বোর্ডিং গেটে মাত্র ৫ জন যাত্রী জালিয়াতিসহ ধরা পড়ার পর, একই ফ্লাইটের আরও ৭১ জন যাত্রী ইমিগ্রেশন পার হয়েও যেভাবে পালিয়ে গেল—তা কেবল নজিরবিহীন নয়, বরং অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ইমিগ্রেশন ও চেকিংয়ের একাধিক স্তর পার হয়ে এই বিপুল সংখ্যক ভুয়া বা সন্দেহভাজন যাত্রী কীভাবে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পৌঁছাল? উত্তরটি স্পষ্ট—পেছনে সক্রিয় রয়েছে সুপরিকল্পিত এবং শক্তিশালী ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ সিন্ডিকেট।
কিছুদিন আগে যখন এই অবৈধ অভিবাসনের পথ বন্ধ করতে এবং মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলাম, তখন এক শ্রেণির মানুষ চিঠির গভীরতা না বুঝে নানা রুচিহীন মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু শনিবারের এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা প্রমাণ করেছে, সেই আশঙ্কা কতটা সত্য এবং সমসাময়িক ছিল।
‘বডি কন্ট্রাক্ট’: ইমিগ্রেশন থেকে মাফিয়া চক্রের মেলবন্ধন
ভিজিট ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসা কিংবা ওমরাহ ভিসার আড়ালে যারা লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন, তারা কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি নন। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধচক্র। বিমানবন্দরের অসাধু কর্মকর্তা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কিছু অসাধু কর্মচারী, দেশীয় দালাল এবং গন্তব্য দেশের (যেমন মালয়েশিয়া) স্থানীয় মাফিয়া চক্র মিলে এই ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে ত্রুটিপূর্ণ বা জাল কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সবুজ সংকেত দিয়ে এদের পার করে দেওয়া হয়। এই চক্রটি রাষ্ট্রের আইন ও নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালাচ্ছে, আর দিনশেষে ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থেকে যাচ্ছে।
“আজ অবৈধভাবে যাও, কাল বৈধ হয়ে যাও”— এই বিপজ্জনক বার্তা মানব পাচারকারীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
মানবিকতার ফাঁদ ও বৈধ অভিবাসীদের অধিকার হরণ
যখনই কোনো দেশে অবৈধ অভিবাসীরা সংকটে পড়েন, তখনই এক শ্রেণির মানুষ ‘মানবিকতার’ দোহাই দিয়ে তাদের বৈধকরণের (Regularisation) দাবি তোলেন। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে মানবিক মনে হলেও, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক।
অপরাধীদের উৎসাহ প্রদান: অবৈধদের ঢালাও বৈধতা দিলে মানব পাচারকারীরা একটি স্পষ্ট বার্তা পায়—“যেকোনো উপায়ে আগে লোক ঢোকাও, পরে পরিস্থিতি বুঝে বৈধ করার আন্দোলন করা যাবে।”
বৈধ অভিবাসীদের ন্যায্যতা হরণ: যারা জমিজমা বিক্রি করে, সরকারের নিয়ম মেনে, বিপুল ব্যয়ে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যান, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অবৈধ শ্রমশক্তির সস্তা জোগানের কারণে বৈধ কর্মীরা তাদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার হারান।
রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও রাজস্ব সংকট: অবৈধ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স ও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের সুশৃঙ্খল অভিবাসন ব্যবস্থার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
রিসিভিং কান্ট্রির কাছে ‘অন্যায় আবদার’ বন্ধ হোক
প্রশাসনিক বা নিয়োগকর্তার জটিলতায় যারা বৈধভাবে গিয়ে অনথিভুক্ত হয়েছেন, তাদের বিষয়টি ভিন্ন। কিন্তু যারা শুরু থেকেই জালিয়াতি, ভিসার অপব্যবহার বা অবৈধ রুট ব্যবহার করে প্রবেশ করেছেন, তাদের জন্য রিসিভিং কান্ট্রির (যেমন মালয়েশিয়া সরকার) কাছে সাধারণ ক্ষমা বা বৈধতার আবদার করা রাষ্ট্রের জন্য একটি কূটনৈতিক পরাজয়। এটি কার্যত মানব পাচারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার শামিল।
রাষ্ট্রের করণীয়: এখন আর নীরব থাকার সুযোগ নেই
অবৈধ অভিবাসন কোনো সাধারণ মানবিক সমস্যা নয়; এটি একটি সংঘবদ্ধ অর্থনৈতিক অপরাধ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই চক্রকে উপড়ে ফেলতে হলে অবিলম্বে সরকারকে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:
অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান: বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন, এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ এবং যেসকল ট্রাভেল এজেন্সি এই ‘বডি কন্ট্রাক্ট’-এর সাথে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ভিসার অপব্যবহার রোধ: ট্যুরিস্ট বা স্টুডেন্ট ভিসার নামে কারা ওয়ান-ওয়ে টিকিট কেটে যাচ্ছে এবং ফিরে আসছে না, তাদের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে হবে। পাচারবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ: গডফাদার এবং মানব পাচারকারী সিন্ডিকেটের অর্থের উৎস খতিয়ে দেখে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন ব্যবস্থা চাই। মানবিকতার সস্তা স্লোগান দিয়ে যারা অবৈধ পথকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছেন, তারা মূলত দেশের ভবিষ্যৎ এবং লাখ লাখ বৈধ প্রবাসীর কপালে কুঠারাঘাত করছেন। সময় এসেছে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে আওয়াজ তোলার। এই মাফিয়া চক্রকে রুখে না দাঁড়ালে, দেশের রেমিট্যান্স খাত এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার—দুটোই একদিন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
Posted ৭:৫০ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬
Sangbad Dinrat | Editor & Publisher