একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো তার নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কর ব্যবস্থার মধ্যে ন্যায়বিচার বজায় রাখা। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি যখন মানবিক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তখন কর বা রাজস্ব আদায়ের নীতিতেও সাধারণ মানুষের স্বার্থের প্রতিফলন থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারাবাহিকতায় হঠাৎ পাস হওয়া অর্থ আইন ২০২৬-এর মাধ্যমে জমি বিক্রির ওপর—তা পাঁচ বছরের অধিক সময় দখলে থাকা জমির ক্ষেত্রে একলাফে ১৫% ফ্ল্যাট কর হোক কিংবা পাঁচ বছরের কম সময় দখলে থাকা জমির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বাভাবিক কর হার (৩০% পর্যন্ত) হোক—এই নতুন মূলধনী লাভ কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) আরোপের সিদ্ধান্তটি দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও সৎ করদাতাদের পিঠ যেন দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। অথচ বিগত ৩০শে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সাধারণ মানুষ এই সংক্রান্ত যে নিয়ম জেনে আসছিল এবং নিয়মিত কর দিয়ে আসছিল, তা হঠাৎ করে বদলে ফেলা হয়েছে।
এটি কেবল রাজস্ব আদায়ের কোনো শুকনো আইনি হিসাব নয়; এর পেছনে লুকিয়ে আছে একেকটি মধ্যবিত্ত পরিবারের আজীবনের সঞ্চয়, রক্ত জল করা শ্রম আর চরম সংকটে বেঁচে থাকার আকুতি।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন জাগে—সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে কর দেয় ও দিতে বাধ্য থাকে, কিন্তু বিনিময়ে তারা পায় কী? নাগরিক হিসেবে আইন মানতে হবে, সরকারকে মানতে হবে, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গাড়ি আগে না ঘোড়া আগে? আইন কি অতীতের জন্য, নাকি ভবিষ্যতের জন্য? বিষয়টি অনেকটা এমন নয় কি—গরুকে যেমন জিজ্ঞাসা করে হাল চাষ করা হয় না, করদাতাদেরকেও তেমন জিজ্ঞাসার দরকার হয় না? এটাই কি গণতন্ত্র? আর এই গণতন্ত্রের জন্যই কি মানুষ বারবার রাজপথে রক্ত দেয়, আপনজন হারায়? এটাই কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষণ?
জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ সালের মধ্যে যেসব জমি বা সম্পদ হাতবদল কিংবা কেনাবেচা হলো, সেগুলো কেন পেছনের তারিখে গিয়ে ২০২৩ সালের সংশোধিত কর আইনের ফাঁদে পড়বে? যদি কোনো নীতিগত পরিবর্তন বা করের বোঝা চাপানোই হতো, তবে গত করবর্ষের পর কেন সাধারণ মানুষকে এই বিষয়ে আগে থেকে কিছুই বলা হলো না বা সচেতন করা হলো না?
বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টির তীব্রতা ও নির্মমতা অনুধাবন করতে আমাদের চারপাশের একটি চিরন্তন উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরা যাক, একজন সাধারণ সৎ পেশাজীবী ২০০৭ সালে তার জীবনের সমস্ত কষ্টার্জিত ১০ লাখ টাকা দিয়ে ভবিষ্যতের সম্বল হিসেবে এক টুকরো জমি কিনেছিলেন। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি তিল তিল করে সেই জমি আগলে রেখেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে জমিটিতে মাটি ভরাট, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, জবরদখল মুক্ত রাখা ও সুরক্ষার পেছনে তাকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়েছে; পাশাপাশি প্রতি বছর নিয়ম মেনে পরিশোধ করতে হয়েছে খাজনা ও ট্যাক্স।
এরপর, ২০২৫ সালের আগস্টে পরিবারের কোনো অতি প্রয়োজনে (যেমন প্রিয়জনের ক্যান্সার চিকিৎসা কিংবা সন্তানের উচ্চশিক্ষার) খরচ জোগাতে নিরুপায় হয়ে তিনি নিজের সেই শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু আমাদের দেশের গ্রাম বা শহরতলীর গতানুগতিক কেনাবেচার ধরন কেমন? আমরা বলতে গেলে সবাই কম-বেশি জানি (তবে বড় চেয়ার পাওয়ার পর যদিও ভুলে বসি) এখানে জমি বিক্রি করতে গেলে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে একটি নির্দিষ্ট মূল্য স্থির করে মৌখিকভাবে চুক্তি করতে হয়। যেমন—মালিক বা বিক্রেতা হিসেবে তিনি ফিক্সড করলেন যে তিনি সব মিলিয়ে ‘৮০ লাখ টাকা’ পাবেন, এর বাইরে জমিটি যত টাকায় বিক্রি হবে, বাকি বাড়তি টাকা দালাল পাবেন লভ্যাংশ বা কমিশন হিসেবে। কিন্তু আইনি জটিলতা ও ক্রেতার বাধ্যবাধকতার কারণে দলিলে মূল বিক্রয় মূল্য (ধরা যাক ১ কোটি টাকা) দেখাতে হয়। ফলে দলিলে যা উল্লেখ থাকে, মালিক বাস্তবে হাতে পান তার চেয়ে অনেক কম টাকা (এই উদাহরণে ২০ লাখ টাকা কম)। অথচ নতুন কর আইনের অন্ধ মারপ্যাঁচে মালিককে এখন কর দিতে হচ্ছে দলিলের পুরো ১ কোটি টাকার ওপরেই! ৫ বছরের কম সময় মালিকানায় থাকলে যা স্বাভাবিক কর হারে (সর্বোচ্চ ৩০% পর্যন্ত) আর বেশি সময় হলে ১৫% ফ্ল্যাট হারে!
এখানেই শেষ নয়, নীতিনির্ধারকদের বানানো আইনে উন্নয়ন খরচ বাদ দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবতার জমিনে তার কোনো প্রতিফলন নেই। দীর্ঘ ১৮ বছরে একটি জমিতে যে লাখ লাখ টাকা উন্নয়ন খরচ হলো, তার রসিদ বা ক্যাশ মেমো গ্রামীণ বা সাধারণ মানুষের পক্ষে দশকের পর দশক সংরক্ষণ করা কি আদৌ বাস্তবসম্মত? কোন দিন সম্ভব? আর দীর্ঘদিন সবাই জানতো উৎস করই ফাইনাল, ফলে ঐ সবের দরকার বা গুরুত্বও ছিল না; তাহলে হঠাৎ কেন এই আইন? আর গ্রামীণ বা উপশহরের যেসব দালাল এই কেনাবেচা করেন, তাদের কয়জন ব্যাংকিং লেনদেনে অভ্যস্ত? এই সম্পূর্ণ নগদ বা ক্যাশভিত্তিক প্রথাগত কমিশনের বা দালালির টাকার কোনো দালিলিক প্রমাণ তো থাকে না। তাহলে বিক্রেতা দালালের কমিশন বা দালালি বাবদ প্রদত্ত টাকাসহ অন্যান্য সব খরচ কর কর্মকর্তার কাছে প্রমাণ করবেন কীভাবে?
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি ঘটে যখন আগস্ট ২০২৬-এ এসে এই সাধারণ মানুষটি বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে যান। কাগজে-কলমে ৯০ লাখ টাকা “লাভ” দেখিয়ে নতুন নিয়ম অনুযায়ী তার কাছে মোট ১৩,৫০,০০০ টাকা গেইন ট্যাক্স দাবি করা হচ্ছে। অথচ রেজিস্ট্রেশনের সময়ই উৎস কর (TDS) বাবদ তার পকেট থেকে অলরেডি ৪,৭৬,০০০ টাকা কেটে রাখা হয়েছিল এবং তিনি জানতেন যে এই উৎস করই তার চূড়ান্ত কর। এখন পূর্বে দেওয়া পৌনে ৫ লাখ টাকা সমন্বয় করলেও তাকে এককালীন নগদ ৮,৭৪,০০০ টাকা কর দিতে হবে!
বাস্তবে যে টাকা মালিকের পকেটেই ঢোকেনি (দালালের অংশ), যে টাকার উন্নয়ন খরচের কোনো প্রমাণ রাখার ব্যবস্থা আমাদের সমাজে নেই এবং যে টাকা ১ বছর আগেই পরিবারের প্রয়োজনে (চিকিত্ত্সার পেছনে বা সন্তানের শিক্ষার জন্য) শেষ হয়ে গেছে—এখন পেছনের তারিখ থেকে আইন চাপিয়ে ১ বছর পর সেই নগদ টাকা দাবি করা চরম অমানবিক ও অবাস্তব নয় কি? বা এক ধরনের জুলুম ও অগণতান্ত্রিক নয় কি? হঠাৎ করে এক বছর পর এই অপ্রত্যাশিত বা পূর্ব থেকে অনবগত কর পরিশোধের টাকা বিক্রেতা এখন পাবেন কোথায়? তিনি কি এখন এই বাড়তি কর দেওয়ার জন্য আবার নতুন করে ঋণ করবেন, নাকি করের টাকা জোগাতে অন্য কোনো সম্পদ বিক্রি করবেন? এটি কতটা মানবিক আর কতটা গণতান্ত্রিক?
আলাদাভাবে বছর শেষে করদাতার ওপর এই বাড়তি করের বোঝা না চাপিয়ে পূর্বের মতো জমি রেজিস্ট্রি করার সময়ই এককালীন উৎস কর কেটে নেওয়াই কি সবচেয়ে উত্তম এবং যৌক্তিক সমাধান নয়? একই সম্পত্তির পেছনে ক্রয়কালীন কর, হোল্ডিং ট্যাক্স, খাজনা এবং রেজিস্ট্রেশনের উৎস কর দেওয়ার পর আবার এই বাড়তি ট্যাক্স মূলত ‘একই মুরগীকে বারবার জবাই করার’ শামিল, যা কোনোভাবেই কি সুশাসনের অংশ হতে পারে?
আইন আপনারা অবশ্যই করবেন, করও আপনারা নিবেন—জনগণ করও দিবে, কিন্তু তা আরোপ করার আগে জনগণের মতামত নেওয়া কিংবা মাঠপর্যায়ের এই বাস্তব প্রথাগুলো বিবেচনা করা উচিত ছিল কি না ভেবে দেখুন? একলাফে এভাবে ১৫% বা স্বাভাবিক হারে না বাড়িয়ে বিষয়টি কি পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে করা যেত না? বুদ্ধিমানের কাজ কিংবা স্বাভাবিক চিন্তার ফসল হতো পূর্বের উৎস করটাই একটু বাড়িয়ে তার সাথে ফাইনাল সেটেলমেন্ট হিসেবে সমন্বয় করা। তাহলে আজ এই তীব্র প্রশ্ন উঠত না, সাধারণ মানুষও ১ বছর পূর্বের অপ্রত্যাশিত আর্থিক বোঝা বহন করে এভাবে টায়ার্ড ও নিঃস্ব হতো না। বিষয়টি নীতিনির্ধারকেরা দয়া করে একটু ভাবুন।
এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ অসহায় মানুষের শেষ আশার আলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের কর ব্যবস্থা সংক্রান্ত সেই যুগান্তকারী ও মানবিক বক্তব্য। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন—”যাঁরা নিয়মিত কর দেন তাঁদেরকে অযথা হয়রানি না করে, যাঁরা কর দিচ্ছেন না অথচ করের আওতাভুক্ত হওয়ার যোগ্য, তাঁদেরকে খুঁজে বের করে করের আওতায় নিয়ে আসা হোক।”
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই জনবান্ধব, প্রজ্ঞাময় ও অসাধারণ দর্শনকে জনগণ ও সাধারণ জনগণ মন থেকে সাধুবাদ জানায়। একটি গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে সৎ করদাতাদের পুরস্কৃত করা উচিত, তাঁদের ওপর জুলুম করে করের হার বাড়ানো নয়। অথচ মাঠপর্যায়ের এই বৈষম্যমূলক ও অসঙ্গতিপূর্ণ আইনটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মূল নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এই তীব্র মূল্যস্ফীতি ও ক্রান্তিকালীন সময়ে সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হওয়া এই অবর্ণনীয় ক্ষোভকে পুঁজি করে কোনো বিশেষ মহল সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর প্রচ্ছন্ন কৌশলে লিপ্ত কি না—তা নীতিনির্ধারকদের গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখা প্রয়োজন। কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট দিতে পারাটাই যেন নাগরিকের একমাত্র প্রাপ্তি না হয়, নীতি নির্ধারণেও জনগণের ব্যথার প্রতিফলন ঘটা জরুরি।
এখনো সময় আছে। নিশ্চয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মহান দর্শনের ওপর শতভাগ আস্থা রাখতে সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করবেন এবং মানুষের পিঠের দেয়ালটি বুঝবেন, মাঠপর্যায়ের প্রথাগত বাস্তবতা ও মানুষের কষ্টকে বিবেচনা করে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিবেন। জমি বিক্রির উৎস করকেই সাধারণ মানুষের জন্য চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করা হোক এবং এই আইনটি অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করে একটি দ্রুত ও মানবিক সমাধান নিশ্চিত করা হোক। রাজস্ব বাড়ানো রাষ্ট্রের জন্য জরুরি, কিন্তু তা যেন সৎ নাগরিকদের নিঃস্ব করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়। নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মানবিক দর্শনের প্রকৃত বাস্তবায়ন ঘটানো আজ সময়ের দাবি।
অধ্যাপক সাবির আমিন রেজা
লেখক: সমসাময়িক অর্থনীতি, শিক্ষা ও কর নীতি বিশ্লেষক
Posted ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Sangbad Dinrat | Editor & Publisher