ছবিটি এআই এর সাহায্যে তৈরি।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায় ঘটনার সময় বিদেশে অবস্থানরত বা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী ব্যক্তিদের আসামি করার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত মোহাম্মদ সাইফুর রহমান, আগা মোহাম্মদ আবদুল হাফিজ, নেওয়াজ শরীফ জনি ও ফারুক আহমেদসহ আরও অনেকের ক্ষেত্রে মামলা, হুমকি এবং দেশে ফিরলে গ্রেপ্তারের আশঙ্কার তথ্য বিভিন্ন নথিতে উঠে এসেছে।
সবচেয়ে সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের নাম মুলাদী থানার ২৪ জুন ২০২৬ তারিখের একটি নতুন মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে তাকে নামীয় আসামিদের তালিকায় রাখা হয়েছে এবং অভিযোগিত ঘটনাটি ২৩ জুন ২০২৬ সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু যুক্তরাজ্যের সরকারি অভিবাসন নথি অনুযায়ী সাইফুর রহমান ১৬ অক্টোবর ২০২৪ যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন এবং এরপর থেকে যুক্তরাজ্যেই অবস্থান করছেন। অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুনের অভিযোগিত ঘটনার সময় তিনি বাংলাদেশে ছিলেন কি না, সেটি তার পাসপোর্ট, যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নথি ও ভ্রমণ-ইতিহাস দিয়ে সহজেই যাচাইযোগ্য।
তার রাজনৈতিক পরিচয়ও নথিভুক্ত। ২০১৮ সালের বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগের একটি সাংগঠনিক তালিকায় মোহাম্মদ সাইফুর রহমানকে অর্থবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সাক্ষাৎকারেও তিনি ২০১৮ সালে যুবলীগের অর্থ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার কথা বলেছেন।
আগা মোহাম্মদ আবদুল হাফিজের ক্ষেত্রেও একই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সরকারি নথিতে দেখা যায়, তিনি ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে যান এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সফর করেন। অথচ তাকে এমন একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে, যার অভিযোগিত ঘটনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকায় সংঘটিত হয়েছে।
নেওয়াজ শরীফ জনি ২৫ এপ্রিল ২০২৪ যুক্তরাজ্যে আসেন বলে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সাক্ষাৎকারে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে রাজনৈতিক কার্যক্রম ও হুমকির বিষয়েও তিনি স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে তথ্য দিয়েছেন।
ফারুক আহমেদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার দাবি যুক্তরাজ্যে আশ্রয়-সংক্রান্ত আইনি কার্যক্রমে নথিভুক্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র দপ্তর তার আওয়ামী লীগ সদস্যপদ গ্রহণ করেছে এবং তার দাবি হিসেবে লুটপাট ও বিস্ফোরক-সংক্রান্ত মামলায় তাকে জড়ানোর বিষয়ও সিদ্ধান্তপত্রে রেকর্ড করেছে।
এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য না মিথ্যা, সেটি শেষ পর্যন্ত আদালত ও নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে এমন কোনো ঘটনার অভিযোগ আনা হলে যখন সরকারি ভ্রমণ-নথি দেখায় যে তিনি ঘটনার সময় অন্য দেশে ছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে কী সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, তা যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া বহু মামলায় অসংখ্য ব্যক্তিকে একসঙ্গে আসামি করা, ঘটনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকা ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ বাংলাদেশেও আলোচিত হয়েছে। সরকারও কিছু মামলা পুনরায় যাচাই এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি না করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে।
এ কারণে সাইফুর রহমান, আবদুল হাফিজ, নেওয়াজ শরীফ জনি, ফারুক আহমেদ কিংবা অন্য যে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে ব্যক্তিগত ও যাচাইযোগ্য প্রমাণই হওয়া উচিত ফৌজদারি দায় নির্ধারণের ভিত্তি।
বিশেষ করে বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট, অভিবাসন নথি, প্রবেশ ও বহির্গমনের ইতিহাস এবং ঘটনার সময় তাদের প্রকৃত অবস্থান যাচাই না করে গুরুতর মামলায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা হলে বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধী করে না, আবার কাউকে আইনের ঊর্ধ্বেও রাখে না। অভিযোগের ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।
এই কারণে ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিতর্কিত মামলাগুলোর দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হয় এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে হয়রানির শিকার না হন।
Posted ১১:৪৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
Sangbad Dinrat | Editor & Publisher