শুক্রবার ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম
শিরোনাম

ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দই

এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ   সোমবার, ০৩ মার্চ ২০২৫
ঐতিহ্যবাহী বগুড়ার দই

দই পছন্দ করে না এমন মানুষ খুব কমই রয়েছে আর তা যদি হয় বগুড়ার দই তাহলে তো কথাই নেই। দই নামটি শুনলেই প্রথমে বগুড়ার নামটি চলে আসে। কী এমন আছে বগুড়ার দইয়ে? বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত বগুড়া জেলার বিখ্যাত বগুড়ার দই। দধি বা দই হল এক ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য যা দুধের ব্যাক্টেরিয়া গাঁজন হতে প্রস্তুত করা হয়।

সারা বাংলাদেশে দই পাওয়া গেলেও স্বাদে ও গুণে অতুলনীয় হওয়ায় বগুড়ার দই দেশ ও দেশের বাইরে খুব জনপ্রিয়।

বগুড়ার দই এর খ্যাতি মূলত ব্রিটিশ আমল থেকে সর্বত্র ছড়িয়ে পরে। ষাটের দশকের প্রথম ভাগে বৃটেনের রানী এলিজাবেথ থেকে শুরু করে মার্কিন মুল্লুকেও গিয়েছে বগুড়ার দই। পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তাদের সহানুভূতি পেতে পাঠিয়েছিলেন এই দই।

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী তৎকালীন পার্লামেন্ট সদস্যদের দই খাইয়ে বাহবা পেয়েছিলেন বলে শ্রী স্বপন চন্দ্র পাল তাঁর দাদুর মুখে শুনেছেন।

বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি প্রথম ইংল্যান্ডে ছড়িয়ে পড়ে ১৯৩৮ সালে। তখন বাংলার গভর্নর ছিলেন স্যার জন এন্ডারসন। তিনি নওয়াব বাড়িতে বেড়াতে এসে প্রথম দইয়ের স্বাদ গ্রহণ করেন। তাঁকে কাচের বাটিতে দই খেতে দেওয়া হয়েছিল। তিনি মুগ্ধ হয়ে এ দই ইংল্যান্ডে রপ্তানির পরিকল্পনা করেছিলেন।

পাকিস্তান আমলেই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী গৌর গোপাল পাল এর দই দেশের বাইরে  পাঠান উপঢৌকন হিসেবে।

বগুড়ার দইয়ের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরপরই বগুড়ারই শেরপুর উপজেলা থেকে। বগুড়ার শেরপুরে প্রথম দই তৈরি হয় প্রায় আড়াইশ’ বছর আগে। বগুড়ার নওয়াব আলতাফ আলী চৌধুরীর (পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর বাবা) পৃষ্ঠপোষকতায় শেরপুরের ঘোষপাড়ার অন্যতম বাসিন্দা শ্রী গৌর গোপাল পাল বগুড়া শহরে দই উৎপাদন শুরু করেন।

তৎকালীন নবাব আলতাফ আলী বগুড়ার শেরপুর গিয়ে গৌর গোপাল পালের সরার দই খেয়ে খুশী হোন এবং গৌর গোপাল পালকে বগুড়া শহরে এনে নবাববাড়ির পাশে থাকতে দেন। বর্তমানে নওয়াববাড়ি রোডে তাঁর উত্তরসূরি দুই সন্তান শ্রী বিমল চন্দ্র পাল ও শ্রী স্বপন চন্দ্র পাল ‘শ্রী গৌর গোপাল দধি ও মিষ্টান্ন ভান্ডার’ নামে সেই প্রাচীন দোকানটি চালু রেখেছেন।

শেরপুরের মতো সুস্বাদু ও মানসম্পন্ন দই দেশের আর কোথাও তৈরি হয় না। কারণ এখানকার আবহাওয়া দই তৈরির জন্য ভালো। এখানকার পানিও সুস্বাদু। তা ছাড়া এত দক্ষ কারিগরও অন্য কোথাও মিলবে না। এখন শেরপুরের বিখ্যাত দইয়ের দোকান সাউদিয়া, জলযোগ, বৈকালী, আলিবাবা, সম্পা ইত্যাদি।

জানা যায়, বানিজ্যিক ভাবে ২০১৩ সালে ভারতের জলপাইগুড়িতে আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলায় প্রথম বগুড়ার দই রপ্তানি হয় খুবই সামান্য পরিমান এবং ২০১৪ সালে ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাচিতে বানিজ্য সম্মেলনে ১০০০ কেজি দইয়ের অর্ডার থাকলেও রপ্তানি পন্য হিসাবে তালিকায় না থাকায় অনেক লবিং করে মাত্র ৫০০ কেজি দই রপ্তানি করা সম্ভব হয় বলে জানা গেছে।

দই কয়েক রকম হয়ে থাকে— টক দই, সাদা দই, চিনিপাতা দই ও মিষ্টি দই। সাধারণত এসব দই মাটির পাত্রে বাজারজাত করা হয়। সরা, পাতিল, কাপ, বাটি ইত্যাদি নামে পাত্র গুলো বেশ পরিচিত।

স্থানীয়দের মতে, সনাতন ঘোষ সম্প্রদায় দই তৈরি করে বগুড়াকে দেশের সর্বত্র পরিচিত করে তুলেছিল। প্রায় আড়াইশ বছরের পুরোনো হলেও স্বর্ণযুগ ছিল স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে। সেসময় এর প্রস্তুত প্রণালী ছিল অতি গোপনীয়। জানা যায়, ঘোষেরা যখন দই তৈরি করত তখন এর গোপনীয়তা বজায় রাখতো, ফলে বাইরের কেউ দই তৈরি করতে পারত না। পরবর্তীতে সেটিকে আর তারা ধরে রাখতে পারেনি। এখন শেরপুরেই অনেক ব্যবসায়ী দই তৈরি করে। এদের মধ্যে ঘোষ পরিবারের লোকদের সংখ্যা অনেক কম। তবে সেই ঘোষদের হাতে এখন আর দইয়ের বাজার নেই। আস্তে আস্তে এটি চলে গেছে মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অধীনে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এতে আলাদা মাত্রা যোগ করেন বগুড়া সদরের মহরম আলী ও বাঘোপাড়ার রফাত আলী।

এখন বগুড়া শহরে জিরো পয়েন্টের সাতমাথায় বেশির ভাগ দইয়ের দোকান। দইয়ের দোকান আছে প্রায় তিন শতাধিক।

দই তৈরিতে প্রয়োজন হয় হয় গরুর দুধ, চিনি, সামান্য পরিমাণ পুরোনো দই ও মাটির একটি হাঁড়ি বা সরা। কড়াই বা পাতিলে দুধ জ্বাল দেয়ার মাধ্যমে দই তৈরি করা হয়ে থাকে।

টক দই তৈরি থেকে বংশ পরম্পরায় তা চিনিপাতা বা মিষ্টি দইয়ে রূপান্তরিত হয়। আর কালের বিবর্তনে স্বাদের বৈপরীত্যের কারণে দইয়ের বহুমুখী ব্যবহার শুরু হয়। টক দই দিয়ে মেজবানের রান্না ও ঘোল তৈরি হয়। অতিথি আপ্যায়নে চলে মিষ্টি দই।

ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বগুড়ার দই। গত ২৬ জুন শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

Facebook Comments Box

Posted ২:৪৩ অপরাহ্ণ | সোমবার, ০৩ মার্চ ২০২৫

Sangbad Dinrat |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

advertisement
advertisement
advertisement

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
 
১০১১
১৩১৫১৬১৯
২০২১২২২৩২৪২৫২৬
২৭৩০ 

উপদেষ্টা সম্পাদক
শহিদুল ইসলাম সাগর
চেয়ারম্যান, বিটিইএ

প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশক
এম.টি.আই স্বপন মাহমুদ

বার্তা, ফিচার ও বিজ্ঞাপন:
+৮৮ ০১৩১৩ ৮৮ ৪৪ ৩৩
ইমেইল: sangbaddinrat@gmail.com

বাংলাদেশ অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসোসিয়েশন কর্তৃক নিবন্ধিত।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদনকৃত।
error: Content is protected !!